প্রেমচন্দ
II ১ II
প্রেমচন্দের সঙ্গে দেখা করার জন্যে তরুণ চন্দ্রহাসন কেরালা থেকে বারাণসী এসেছেন। অনেক খোঁজাখুজি করে তিনি শেষ পর্যন্ত লেখকের বাড়ি খুঁজে পেলেন। কিন্তু বিস্তর ডাকাডাকি করার পরেও বাড়ি থেকে কোনো সাড়াশব্দ এল না। অগত্যা তিনি সামনের খোলা দরজা দিয়ে ভয়ে ভয়ে উঁকি মারলেন ভেতরে। ঘরের মধ্যে একটা ঝাঁকড়া গোঁফওয়ালা লোক একটা ছোট্ট চৌকির ওপর বসে একমনে কী যেন লিখছিল। ঘরে জিনিসপত্তর বলতে কিছু নেই। গোঁফওয়ালা লোকটার চেহারা এক্কেবারে সাধারণ, তাকে দেখে এই আগন্তুকের মনে হল লোকটা নির্ঘাত বিখ্যাত লেখকের কোনো কেরানী-টেরানি হবে।
তরুণটি এবার ঘরে ঢুকে বলল, “আমি মুন্সী প্রেমচন্দের সঙ্গে একটু দেখা করতে চাই।” তাই না শুনে প্রেমচন্দ অবাক হয়ে তরুণটির দিকে তাকালেন, তারপর হাতের কলম নামিয়ে রেখে হো-হো করে হেসে উঠে বললেন, “অবশ্যই, অবশ্যই দেখা হবে—কিন্তু আপনি দাঁড়িয়ে কেন, বসুন।”
তরুণ উর্দু কবি নাশাদ একবার প্রেমচন্দের সঙ্গে দেখা করতে লখনউতে গিয়েছিলেন। তিনি আগে কখনও প্রেমচন্দকে দেখেন নি। প্রেমচন্দ কোন অঞ্চলে থাকেন মোটামুটি জানলেও বাড়িটা ঠিক চিনতেন না। রাস্তার একটা লোককে তাই জিজ্ঞেস করলেন, “মুন্সী প্রেমচন্দের বাড়িটা আমাকে একটু দেখিয়ে দেবেন?” লোকটাকে গেঁয়ো-গোছের দেখতে, পরনে আধময়লা ধুতি আর গেঞ্জি।
লোকটা বলল, “হ্যাঁ হ্যাঁ নিশ্চয় দেখিয়ে দেব, আসুন।”
তরুণ কবি লোকটার পিছু-পিছু হাঁটতে লাগলেন। একটু পরেই ওরা একটা বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল। তারপর সিঁড়ি ভেঙে দোতলায় উঠে প্রায় খালি একটা ঘরে এসে ঢুকল ওরা। লোকটা নাশাদকে সেখানে অপেক্ষা করতে বলে ভেতরের ঘরে চলে গেল। একটু পরেই লোকটা ফিরে এল গেঞ্জির ওপর একটা জামা চাপিয়ে।
লোকটার মুখে দুষ্ট-দুষ্ট হাসি, হাসতে হাসতেই বলল, “মুন্সী প্রেমচন্দ আপনার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন, কী বলবেন, বলুন।”
১৯৩৪ সালের এপ্রিল মাস। দিল্লীতে অনুষ্ঠিত হচ্ছে হিন্দী লেখক সম্মেলন। এই সম্মেলনে কথাসাহিত্য বিভাগের সভাপতি মনোনীত হয়েছিলেন প্রেমচন্দ। তিনি তখন তাঁর খ্যাতির শীর্ষে, কিন্তু তাই বলে তিনি উদ্যোক্তাদের কাছে বিশেষ কোনো সুযোগ-সুবিধা দাবী করেন নি। প্রখ্যাত হিন্দী ঔপন্যাসিক জৈনেন্দ্রকুমার তাঁর সম্পর্কে বলেছিলেন, “তিনি এখানে এসে আর পাঁচজন সাধারণ লোকের মতো ছিলেন। তাঁর শোবার জায়গা ছিল বারোয়ারি শোবার ঘরে। শোবার ঘরটা ছিল ঠিক হাসপাতালের সাধারণ বিভাগের মতো। কিন্তু এ-নিয়ে তিনি একদিনের জন্যেও কোনো অভিযোগ করেন নি। তিনি খেতে যেতেন ক্যানটিনে।”
“টিকিট? কোত্থেকে পাওয়া যায় বলুন তো?”
“কিনতে হলে ওই জানলায় পাবেন, না হলে আপনাকে অফিস থেকে যোগাড় করে নিতে হবে।” স্বেচ্ছাসেবকটি কিন্তু জানত না যে, সে কার সঙ্গে কথা বলছে।
প্রেমচন্দ আর একটিও কথা না বাড়িয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে টিকিট কিনলেন।
এই লোকটির চরিত্রের মস্ত গুণ ছিল সারল্য।
এবার ঘটনাস্থল লাহোর। সাল ১৯৩৫। প্রখ্যাত উর্দু নাট্যকার ইমতিয়াজ আলি তাজ প্রেমচন্দকে চায়ের নেমন্তন্নে ডেকেছিলেন। তিনি এককথায় নিমন্ত্রণ গ্রহণ করেছিলেন, কিন্তু তাঁর কি কাজের শেষ আছে! সারাদিন লাহোরের রাস্তায়-রাস্তায় ঘোরাঘুরি করে তিনি নাট্যকারের বাড়িতে গিয়ে হাজির হলেন। তাঁর পরনে খাটো ধুতি, গায়ে মোটা কাপড়ের জামা। বাড়িটার সামনে একশ’র ওপর মোটরগাড়ি দাঁড়িয়ে, আর গাড়িগুলো কী দারুণ দেখতে! নিমন্ত্রিতদের মধ্যে ছিলেন ডাক্তার, বিচারক, আইনজীবী, অধ্যাপক। এক কথায় শহরের সমস্ত গণ্যমান্য ব্যক্তিরা সেখানে উপস্থিত হয়েছিলেন। এঁদের মধ্যে অনেকেই প্রেমচন্দকে আগে দেখেন নি, যখন দেখলেন তখন অবাক হয়ে গেলেন।
কী আশ্চর্য! এই সাধাসিধে গাঁইয়া লোকটা কি না বিখ্যাত প্রেমচন্দ! এঁকে দেখার জন্যেই এত লোক এতক্ষণ ধরে অপেক্ষা করে আছে!
প্রেমচন্দকে নিয়ে এইরকম অনেক গল্পকথা আছে। সেগুলো শুনলে বোঝা যায় কী সরল প্রকৃতির মানুষ ছিলেন তিনি। তিনি অন্য কারও মতো ছিলেন না, তিনি ছিলেন ঠিক তাঁর নিজের
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments